সোমবার ২২শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৮ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম >>
শিরোনাম >>
ইতিহাসে প্রথমবার প্রকাশ্যে দানের টাকা গণনা

শাহজালাল মাজারের দানবাক্সে ৩ দিনে ১৭ লাখ ৬৫ হাজার টাকা

অনলাইন ডেস্ক   |   সোমবার, ২২ জুন ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   24 বার পঠিত

শাহজালাল মাজারের দানবাক্সে ৩ দিনে ১৭ লাখ ৬৫ হাজার টাকা

মাজার কর্তৃপক্ষের আপত্তির মধ্যেই মাত্র ৩ দিনের মাথায় সিলেটে হযরত শাহজালাল (রহ.) এর মাজারে দানবাক্সের টাকা গণনা করা হয়েছে|

সোমবার (২২ জুন) সিলেটের সদ্য বদলীর আদেশ হওয়া জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলমের উদ্যোগে মাজারের ৭০০ বছরের ইতিহাসে এই প্রথমবার প্রকাশ্যে দানবাক্সের টাকা গণনা করা হয়|

জেলা প্রশাসকের উপস্থিতিতে বেলা ২টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৬ টা পর্যন্ত গণনায় মোট ৩৬ জন  স্বেচ্ছাসেবক অংশ নেন| গণনা তদারকি করেন আরও ৩ জন|

গণনা শেষে গত ৫ দিনে ১৭ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪৯ টাকা, সাত তোলা স্বর্ণালঙ্কার ছাড়াও রিয়াল, ডলার, পাউন্ডও পাওয়া গেছে|
দানবাক্সে বেশিরভাগই এক হাজার ও ৫০০ টাকার নোট ছাড়া ১০০/৫০ থেকে ১০/২০ টাকারও অসংখ্য নোট পাওয়া গেছে| মাজারের ওয়াকফ স্টেট অফিসার সজল মিয়া এ তথ্য নিশ্চিত করেন|

মাত্র ৩ দিনের ব্যবধানে এতো টাকা ওঠায় শতাব্দির পর শতাব্দি মাজারে কি পরিমাণ টাকা ওঠেছে, এ নিয়ে নানা প্রশ্নে ছুঁড়ে দিচ্ছেন বিভিন্ন শ্রেনী পেশার মানুষ|

গত বৃহস্পতিবার হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারের দানের ৩টি ডেকচি সিলগালা করে জেলা প্রশাসন| সেইসাথে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাজারে দানবাক্স বসানো হয়| মাজারের অর্থ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনয়নের স্বার্থে পিতলের ডেকচি সিলাগালা করে নিজস্ব দানবাক্স বসায় জেলা প্রশাসন|

হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর দরগাহে থাকা সিলগালা করা তিনটি ডেগের তালা খুলে দিয়েছেন সদ্য সাবেক জেলা প্রশাসক (ডিসি) সারওয়ার আলম| একইসঙ্গে জেলা প্রশাসনের স্থাপন করা দানবাক্সগুলো খুলে গত চার দিনে জমা হওয়া অর্থ গণনার কাজ শুরু হয়েছে|

সোমবার (২২ জুন) জোহরের নামাজের পর মাজার প্রাঙ্গণে এসব দানবাক্স ও ডেগের তালা খুলে দেন সারওয়ার আলম| পরে ডেগ ও দানবাক্সগুলোর অর্থ বের করা হয়| এরপর মাজার প্রাঙ্গণে প্রকাশ্যে দানের টাকা গণনার কার্যক্রম শুরু হয়| এখনও চলছে টাকা গণনা|

মাজার সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি ও জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শাহজালাল (রহ.) ও শাহপরান (রহ.)-এর মাজারের দানের টাকার আয়-ব্যয়ের ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসন উদ্যোগ নেওয়ার পর ডিসিকে প্রত্যাহারের ঘটনা ঘটে| এ নিয়ে জন্ম দিয়েছে নানা আলোচনা-সমালোচনা| ঠিক তখন সোমবার বেলা ১টা ১৫ মিনিটে শাহজালালের মাজারে উপস্থিত হন জেলা প্রশাসক| বিদায়ের আগে মাজারে জেলা প্রশাসকের এই আকস্মিক উপস্থিতিতে দেখা দেয় সবার মাঝে কৌতূহল| এরপর খুলে দেন সিলগালা করা তিনটি ডেগের তালা| পাশাপাশি জেলা প্রশাসনের স্থাপন করা দানবাক্সগুলো খুলে জনসম্মুখে টাকা গণনার কাজ শুরু করেন| এই টাকা গণনা শেষে ধারণা মিলবে যুগের পর যুগ দানের কত টাকা হয়েছে লুট| এমনকি দিনে কত টাকা দান আসে, তাও জানা যাবে|

সিলেট জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আবদুল বাছিত মোল্লা জানান, সোমবার শাহজালালের মাজারে জোহরের নামাজ আদায় করেন জেলা প্রশাসক| নামাজ শেষে বেলা ২টার দিকে প্রশাসনের উপস্থিতিতে সিলগালাকৃত ডেগ ও জেলা প্রশাসনের স্থাপনকৃত দানবাক্সের তালা খোলা হয়| পরে ডেগ ও দানবাক্স থেকে টাকা বের করা হয়| পরে সেগুলো গণনার জন্য নির্ধারিত স্থানে নেওয়া হয়| বিকাল ৫টা পর্যন্ত টাকা গণনা কার্যক্রম চলছে| দানের টাকা গণনা শেষে আনুষ্ঠানিকভাবে মোট প্রাপ্ত অর্থের পরিমাণ প্রকাশ করা হবে|’

মাজার সংশ্লিষ্ট দুই ব্যক্তি জানিয়েছেন, মাজারের ইতিহাসে এই প্রথম প্রকাশ্যে এভাবে দানের বাক্স ও ডেগ খুলে টাকা গণনার কার্যক্রম শুরু হলো| এতে জানা যাবে দিনে কী পরিমাণ অর্থ ডেকে পড়তো এতদিন|

টাকা গণনার কাজে অংশ নিয়েছেন মাদ্রাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা| এর মধ্যে এক শিক্ষক জানিয়েছেন, আজকের দিন ছাড়া বিগত ইতিহাসে দানের টাকা ও মানতের পশু, স্বর্ণালঙ্কার এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ধনাঢ্য ব্যক্তিবর্গের মাসিক দানের টাকা ভাগবাঁটোয়ারা হতো| প্রকাশ্যে এসব টাকা এতদিন লুট হলেও কেউ কিছু বলতো না| গত বৃহস্পতিবার জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাজারের দানের তিনটি ডেগ সিলগালা করা হয়| আজ মাত্র চার দিন পর সোমবার সেই ডেগের তালা খুলে গণনায় নেমেছে জেলা প্রশাসন|

টাকা গণনা করতে করতে মাজার মাদ্রাসার একজন শিক্ষক বলেন, ‘এই চার দিনের টাকার হিসাব থেকেই জানা যাবে, যুগের পর যুগ ধরে এই মাজারে দানের কত টাকা লুট হয়েছে| দিনে কত টাকা আসে| এসব টাকা কোথায় যায়| এরপর এই লুটের সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার দাবি তুলবো আমরা|’

গত বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) বিকালে হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর দরগাহে থাকা দানের তিনটি ডেগ সিলগালা করে জেলা প্রশাসন| এর বদলে জেলা প্রশাসনের ব্যবস্থাপনায় দানবাক্স স্থাপন করা হয়েছিল| জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মাসুদ রানার উপস্থিতিতে নতুন দানবাক্স স্থাপনের পাশাপাশি নিরাপত্তার জন্য আনসার সদস্যও নিয়োজিত করা হয়|

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, গত শুক্রবার (১২ জুন) সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম হজরত শাহজালাল (রহ.) ও হজরত শাহপরান (রহ.)-এর মাজার পরিদর্শনে যান| এ সময় তিনি মাজারের আয় ও ব্যয়ের ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে উদ্যোগ নেওয়ার ঘোষণা দেন| এরই অংশ হিসেবে বৃহস্পতিবার বিকালে মাজারে থাকা আগের দানবাক্স সিলগালা করে নতুন দানবাক্স স্থাপন করা হয়| পাশাপাশি মাজারে মানুষের দানের নগদ অর্থ ও অন্যান্য সামগ্রী রাখার জন্য থাকা ঐতিহাসিক তিনটি দানের ডেগ সিলগালা করা হয়| নতুন দানবাক্স বসানোর পর জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়, মাজারের দান সংগ্রহের প্রক্রিয়াকে আরও সুশৃঙ্খল ও নিরাপদ করতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে| এখন থেকে ভক্তদের দেওয়া সব দান প্রশাসনের তত্ত্বাবধায়নে থাকা এই দানবাক্সগুলোতে জমা হবে| আগে যেমনটা হাতে হাতে দানের টাকা নেওয়া হতো, এখন আর এমনটা করা যাবে না| প্রশাসনের স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হবে|

এ ঘটনার পর ওই দিন রাত সাড়ে ৮টার দিকে মাজারভক্তরা দরগাহ প্রাঙ্গণে জড়ো হয়ে ‘শাহজালাল, শাহজালাল’ স্লোগান দিয়ে বিক্ষোভ করেন| এ সময় প্রশাসনের ব্যবস্থাপনায় দানবাক্স স্থাপনের বিষয়ে অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করেন| জেলা প্রশাসনের এই পদক্ষেপকে মাজারের অভ্যন্তরীণ ঐতিহ্য ও ব্যবস্থাপনায় অযাচিত হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখেন মাজারের খাদেম, আশেকান এবং ভক্তদের বড় অংশ| এমন পদক্ষেপের পর ‘আশেকানে আউলিয়া বাংলাদেশ’-এর মতো কিছু সংগঠনের পক্ষ থেকে ডিসি সারওয়ার আলমের তীব্র সমালোচনা করা হয়| তাকে ব্যর্থ জেলা প্রশাসক হিসেবে আখ্যা দিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়|

এর মধ্যে রবিবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাকে প্রত্যাহার করে মন্ত্রণালয়ে উপসচিব হিসেবে সংযুক্ত করে| যদিও সরকারি প্রজ্ঞাপনে প্রত্যাহারের সুনির্দিষ্ট কোনও কারণ উল্লেখ করা হয়নি| তবে দানবাক্স ও তহবিল ব্যবস্থাপনা এবং মাজার এলাকায় জেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপের জেরে সৃষ্ট বিতর্ক ও সমালোচনার মুখে তাকে প্রত্যাহার করা হয়েছে বলে জানান অনেকে| দানবাক্স ও তহবিল ব্যবস্থাপনা এবং মাজার এলাকায় জেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপের জেরে সৃষ্ট বিতর্ক ও সমালোচনার মুখে তাকে প্রত্যাহার করা হয়েছে বলে জানালেন জাতীয় ইমাম সমিতির জেলা সভাপতি ও মাজারের ভক্তসহ একাধিক লোকজন|

Facebook Comments Box

Posted ৭:৪২ অপরাহ্ণ | সোমবার, ২২ জুন ২০২৬

ajkersangbad24.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

এ বিভাগের আরও খবর

সম্পাদক
ফয়জুল আহমদ
যোগাযোগ

01712000420

fayzul.ahmed@gmail.com