



প্রফেসর ড. জাকিয়া বেগম | শনিবার, ০৯ আগস্ট ২০২৫ | প্রিন্ট | 206 বার পঠিত

মানুষ, প্রাণী ও উদ্ভিদ পরিবেশের অংশ।বসবাসের জন্য এবং নিজস্ব স্বকীয় বৈশিষ্ট্য পরিস্ফুটনের জন্য এদের মধ্যেকোনটির প্রয়োজন হয় সমতল ভ’মি বা পাহাড়, কোনটির জলাধার আবার কোনটির বিস্তীর্ন বণাঞ্চল। সেইসাথে সুস্থভাবে বেঁচে থাকাব জন্য নির্মল বাতাস, আলো, পানি ও মাটির প্রয়োজন হয়।কিন্তু সেই পরিবেশ যখন বিভিন্ন কারণে দূষণযুক্ত হয়ে পড়ে তখন তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা অনেক ক্ষেত্রেই অসম্ভব হয়ে ওঠে।
শিল্প-বিপ্লব ও জীবন-যাত্রার আধূনিকায়ন সেই সাথে প্রকৃতি ও পরিবেশ বিরোধী বিভিন্ন কর্মকান্ড, জীবাশ্ম-জ্বালানী, প্লাস্টিক ও ভারী ধাতুর অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার, মারণাস্ত্র ও যুদ্ধাস্ত্রের ব্যবহার, শব্দ ও আলো দূষণ ইত্যাদিপ্রতিনিয়তই সুন্দর এই বিশ্বের পরিবেশকে বিপন্ন ওদুর্বিষহ করে তুলছে। ইদানিং পরিবেশ দূষণেরমাত্রা এতটাই মারাত্মক এবং ভয়াবহ হয়ে উঠেছে যে অনেক প্রজাতির প্রাণী ও উদ্ভিদই তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে না পেরে এরই মধ্যে বিরল পর্যায়ে পৌঁছে গেছে।
আমরা জানি পরিবেশের এই ভয়াবহ অবস্থার জন্য দায়ী একমাত্র মানুষ। আর মনুষ্যবিহীন প্রকৃতি যে কতটাই নিরাপদ তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ মেলে ইউক্র্রেনের অদূরে অবস্থিত চেরনোবিল নামক স্থানটিতে যেখানে ঘটে গিয়েছিল ইতিহাসেরঅন্যতম ভয়াবহ পারমাণবিক দুর্ঘটনা। ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ থেকে ১৩০ কিলোমিটার উত্তরে এবং বেলারুশের সীমান্ত থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত পারমাণবিক স্থাপনাটি ১৯৭০ থেকে ১৯৮০ সালের মধ্যে ৪টি চুল্লীর সমন্বয়ে গড়ে ওঠে। কিন্তু ১৯৮৬ সালের ২রা এপ্রিল অসাবধানতাবশতঃ স্থাপনাটির একটি চুল্লীতে আগুন ধরেভয়াবহ এক দুর্ঘটনা ঘটে যায়। চুল্লীগুলোতে নক্শাতে এবং গঠণগত অনেক ত্রুটি থাকায় দুর্ঘটনার সাথে সাথেই প্রচন্ড বিস্ফোরন ঘটে। চুল্লীর বিভিন্ন অংশের ভাংগা জঞ্জাল বৃষ্টির মত চতুর্দিকে এবং তেজস্ক্রিয় জ্বালানী থেকে বিকিরণের মেঘ দ্রুত পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে, চুল্লী থেকে আগুন পাশ্ববর্তী স্থাপনাগুলোতে বিস্তৃতি লাভ করে। তাৎক্ষণিকভাবে ২ জনসহ দুর্ঘটনার ১ মাসেরমধ্যে ৩১ জন এবং পরবর্তীতে আরও প্রায় ৪০০০ মানুষ তেজস্ক্রিয় দূষণযুক্ত বিভিন্ন জটিলতায় মারা যায়। উন্মুক্ত স্থান, জলাশয়, সবুজ মাঠ, বনাঞ্চল এবং কৃষিক্ষেত্রগুলো উচ্চ মাত্রায় দূষণযুক্ত হয়ে পড়ে। প্রায় ১৪৪,০০০ হেক্টর কৃষিজমি এবং ৪৯২,০০০ হেক্টর বনাঞ্চল দীর্ঘদিনের জন্য স্বাভাবিক ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়ে। দুর্ঘটনা কবলিত এলাকা থেকে প্রায় ১ লক্ষ লোক বাসস্থান ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয় এবং ২টি শহরসহ বহু গ্রাম মানবশূন্য হয়ে পড়ে।পারমাণবিক এই মহা দুর্যোগের পর তৎকালীন সোভিয়েট ইউনিয়ন কর্তৃপক্ষ দুর্ঘটনা স্থানের চতুস্পার্শ্বস্থ সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্থ ২৮০০ বর্গকিলোমিটার এলাকাকে বিধ্বস্ত এলাকা হিসেবে গণ্য করে এবং মনুষ্য বসবাসের অনুপোযোগী বিবেচনায় ‘বর্জনীয় স্থান’ বলে ঘোষণা করে।
মানুষ ছাড়াও দুর্ঘটনা সংলগ্ন স্থান এবং চতুষ্পার্শ্বস্থ এলাকার বহু বন্য ও গৃহপালিত পশু-পাখী তেজস্ক্রিয়তার তাৎক্ষণিক প্রভাবে মারা যায়।বেঁচে যাওয়া দূষণযুক্ত অনেক গৃহপালিত পশুকে মেরে ফেলা হয় বা দুর্ঘটনা কবলিত এলাকা থেকে সরিয়ে নেয়া হয়। চেরনোবিলের নিকটবর্তী বনাঞ্চলে অন্ততঃ প্রায় ছয় মাস পর্যন্ত বন্যপ্রাণীর স্বাস্থ্যের ব্যাপক অবনতি ঘটতে দেখা যায়। পানি দূষণযুক্ত হয়ে পড়ায় জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণীও ক্ষতিগ্রন্ত হয়
বিস্তীর্ণ এলাকার উদ্ভিদ ও গাছপালা সরাসরি দূষণযুক্ত হয়ে পড়ে। উদ্ভিদ যে স্থানে বেড়ে ওঠে সে স্থানের পানি ও মাটিতে মিশ্রিত তেজস্ক্রিয়তা খাদ্যচক্র দ্বারা উদ্ভিদের দেহে প্রবেশ করে, এমনকি ফল-মূলের মধ্যেও বিস্তৃতি লাভ করে এবং তা মানুষ ও অন্যান্য জীব-জন্তুর জন্য বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। দুর্ঘটনা পরবর্তী সময়েএভাবেও অনেক উদ্ভিদ,গাছপালা এবং পশু-পাখী তেজস্ক্রিয় দূষণযুক্ত হয়ে পড়ে।পাইন গাছ অধ্যুষিতচেরনোবিলের পাইন বাগানসহ অন্যান্য গাছপালার বেশীর ভাগই পুড়ে যেয়ে লালচে রং ধারন করে, আর তাই এলাকাটি ‘রেডফরেস্ট’ নামে পরিচিতি পায়। পুড়ে যাওয়া গাছসহ দূষণযুক্তসব গাছকেটে মাটি চাপা দেয়া হয়।
বিকিরণ জিনগত পরিবর্তন (মিউটেশন) দ্বারা ব্ংশগতির ধারা এবং বৈশ্ষ্ট্যিসমূহকে বিকৃত বা পরিবর্তিত করে তোলার সম্ভাবনা বৃদ্ধি করে। চেরনোবিল দুর্ঘটনার পরবর্তী সময়ে আক্রান্ত পশুদের মধ্যে জন্মগত ত্রটিযুক্ত বংশধর প্রসব করার প্রবণতা বৃদ্ধি পেতে দেখা যায়। কোন কোনটির মধ্যে জন্মগত ত্রুটি এতটাই প্রকট ছিল যে সেগুলো তাৎক্ষণিকভাবে বা জন্মের কিছুদিনের মধ্যেই মারাযায়।্ পরবর্তীতে বেঁচে যাওয়া জন্মগত ত্রুটিযুক্ত প্রাণীগুলোর প্রজনন ক্ষমতাও হ্রাস বা লোপ পেতে দেখা গেছে। ঐ এলাকায় এখনও কোন কোন পশু-পাখী জিনগত মিউটেশন নিয়ে জন্মায়।
পারমাণবিক দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে পরিবেশে ছড়িয়ে পড়া তেজস্ক্রিয় বস্তুর বড় একটা অংশই আবহাওয়া দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ও প্রাকৃতিকভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে খুব দ্রুত হ্রাস পেতে থাকে। কম অর্ধায়ুবিশিষ্টবস্তু থেকে বিকিরণ ছড়ানোর মাত্রা দ্রুত হ্রাস পায় এবং কয়েক মাসের মধ্যেই তা সহনীয় মাত্রায় পৌঁছে যায় আর যেগুলোর অর্ধায়ু বেশী সেগুলোর ক্ষেত্রে হ্রাস প্রাপ্তির প্রক্রিয়া বহুদিন পর্যন্ত চলতে থাকে এবং যতদিন পর্যন্ত বিকিরণ মাত্রা বেশী থাকে ততদিন পর্যন্ত স্থানটিকে বসবাসের জন্য অনিরাপদ করে রাখে।
‘বর্জনীয় স্থান’ ঘোষণা করা হলেও বিজ্ঞানীরাদুর্ঘটনা কবলিত এলাকাটিকে সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধানে রেখে পরিবেশ, জীব-জন্তু ও উদ্ভিদের উপর তেজস্ক্রিয়তার প্রভাব এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করার প্রক্রিয়া চালিয়ে যেতে থাকেন।
চেরনোবিলে যদিও খুবই উচ্চ মাত্রার তেজস্ক্রিয়তার নির্গমন ঘটেছিল কিন্তু পরবর্তীতে আক্রান্ত স্থানগুলোর মাটি, পানি ও বাতাসে রেডিয়েশনের মাত্রা দ্রুততার সাথে হ্রাস পেতে থাকে। মাস খানেকের মধ্যেই প্রাথমিক দূষণের খুব কম শতাংশই পরিবেশে বিদ্যমান থাকে এবং এক বৎসরের মাথায় তা ১% এরও নীচে নেমে আসে। তবে বেশী অর্ধায়ূবিশিষ্ট তেজস্ক্রিয় বস্তুর ক্ষতিকর প্রভাব পরিবেশে সুদীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকবে।
কোন বিপর্যয়ের পর স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসার অদ্ভুত একটি ক্ষমতা আছে প্রকৃতির। আর মনুষ্য বসতি ও জীববৈচিত্র ও পরিবেশের উপর চাপ সৃষ্টিকারী কর্মকান্ড হ্রাস করতে পারলে প্রকৃতি আপন ক্ষমতা ও মহিমাতেই উজ্জীবিত হয়ে উঠতে পারে।দুর্ঘটনার প্রাথমিক ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার পর চেরনোবিলেরপ্রকৃতিওআস্তে আস্তে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে থাকে এবং কয়েক বৎসরের মধ্যে প্রায় ভূতুরে ও কোলাহলহীন এলাকাটি প্রাকৃতিক ভাবেই ঘন জঙ্গলে ঢেকেযায়।কম আক্রান্ত এলাকা থেকে প্রাণীগুলো কোলাহলহীন এই এলাকায় ফিরতে থাকে, নতুন প্রজন্মের আগমন ঘটে এবং ছোট-বড় মেরুদন্ডী প্রাণী, বিভিন্ন প্রকার উভচর প্রাণী, বহু প্রজাতির মাছ, পাখী ছাড়াও অসংখ্য ধরনের পোকা-মাকরের নির্ভয় আবাসস্থলে পরিণত হয় এবং এলাকাটি জীববৈচিত্রে ভরপুর হয়ে ওঠে।
রাশিয়া ও ইংল্যান্ডের বিজ্ঞানীরা ইউক্রেনের এই এলাকার উপর বিস্তৃত গবেষণা চালান। দেখা যায়‘বর্জিত এলাকা’-তে ১৯৮৭ থেকে ১৯৯৬ সালের মধ্যে শূকর, ছোট হরিণ, লম্বা শিংবিশিষ্ট বড় হরিণের সংখ্যার যেন বিস্ফোরন ঘটেছে। নেকড়ের পরিমাণ ৭ গুণ বৃদ্ধি পায়,ইউরোশিয়ান বনবিড়াল, নেকড়ে, বাদামী ভাল্লুক, কালো রংয়ের সারস পাখী, ইউরোপিয়ান বন্য ষাঁড়সহগবেষকরাবিরল প্রজাতির বিভিন্ন গাছপালা ও প্রাণীর অস্তিত্বওদেখতে পান।কয়েক বৎসরের মধ্যে এই অঞ্চলে স্তন্যপায়ী প্রাণীর সংখ্যা প্রাকৃতিকভাবে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের প্রায় সমান পর্যায়ে পৌঁছে যায়। বিভিন্ন প্রজাতির প্রায় ৪০০ প্রাণীর উপর গবেষণা চালিয়ে দেখা গেছে এদের বৃদ্ধি স্বাভাবিক এবং কোন কোন ক্ষেত্রে এগুলো বেশ স্বাস্থ্যবান, বংশবৃদ্ধিও স্বাভাবিক পর্যায়ে এসেছ্ েএবং এগুলো যে মোটামুটি দীর্ঘদিন ধরে বেঁচে আছে সেই প্রমানও পাওয়া গেছে। এ থেকে বিজ্ঞানীদের ধারণাহয় কোন কোন বন্য প্রাণীর তেজস্ক্রিয়তা সহ্য করার ক্ষমতা অথবা অভিযোজন ক্ষমতা বেশী যার কারণে দেহের গঠনগত ও কার্যগত বৈশিষ্ট্যের পরিবর্তন ঘটানোর মাধ্যমে তেজস্ক্রিয়তাযুক্ত প্রতিক’ল পরিবেশেও জীবন টিকিয়ে রাখার ক্ষমতা অর্জন করতে পেরেছে (এই বিষয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে)। তাদের মতে তেজস্ক্রিয়তাজনিত মিউটেশন জনসংখ্যাকে প্রভাবিত করেছিল ঠিকই কিন্তু বিশেষ করে উদ্ভিদ ও গাছপালা এবং পশুসম্পদের ক্ষেত্রে তা বৃহৎ আকারের বংশ বৃদ্ধি আটকাতে পারে নি, কারণ এই নয় যে, তেজস্ক্রিয়তা পরিবেশের জন্য ভাল বরং মনুষ্য সৃষ্ট দূষণজনিত কর্মকান্ডগুলো জীবন টিকে থাকা ও বিস্তৃতি লাভেরক্ষেত্রে অধিক অন্তরায়।
‘বর্জনীয় স্থান’ ঘোষিত চেরনোবিলেরবনাঞ্চলটি বর্তমানে ইউরোপের মূল ভ’খন্ডের মধ্যে তৃতীয় বৃহত্তম প্রাকৃতিক সংরক্ষিত এলাকা রূপে আত্ম প্রকাশ করেছে। বৈচিত্রপূর্ণ বনাঞ্চল ও পত্র-পল্লবের সৌন্দর্য, বন্যপ্রাণীর প্রাচুর্যতা ও জীব-বৈচিত্রের কারণে বর্তমানে পর্যটকদের কাছে স্থানটি আকর্ষনীয় হয়ে উঠেছে। বিগত কয়েক বছর ধরে প্রতি বছর প্রায় ১ লক্ষ পর্যটক পৃথিবীর সর্ব বৃহৎ পারমাণবিক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাটি পরিদর্শনে আসছে। ইউক্রেনের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব লাইফ এন্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স’-এর বনায়ন বিশেষঙ্গ সার্গেই জিবতস্সেভ ব্যঙ্গ করে বলেন, ‘একটি জীববৈচিত্র্যে ভরপুর পরিবেশ গড়ে তুলতে এমন একটি ধ্বংসাত্মক পারমাণবিক দুর্ঘটনার প্রয়োজন হলো’!
কিন্তু দুঃখের বিষয় অতি সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়া-ইউক্রেইনের যুদ্ধ এই প্রাকৃতিক সম্পদকে আবার হুমকির সম্মুখীন করে তুলছে এবং গবেষণার সুযোগগুলোকেও সঙ্কুচিত করে ফেলছে। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না মানুষ যদি এই বিশ্বে সুখ-স্বাচ্ছন্দে টিকে থাকতে চায় তাহলে তাদেরকে অবশ্যই যুদ্ধ-বিগ্রহ পরিত্যাগ করতে হবে এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা কল্পে জীব-বৈচিত্র রক্ষা, বনাঞ্চল সংরক্ষণ, ভ’মিদূষণ ও ক্ষয়রোধ, পানিদূষণ রোধ ইত্যাদি বিষয়েগুরুত্ব দিতে হবে।
লেখক : পরমাণু বিজ্ঞানী ও অধ্যাপক, ইস্টার্ণ ইউনিভার্সিটি, সাভার, ঢাকা, বাংলাদেশ। মোবাইল: ০১৯১১৩৬৪১০৩।

Posted ১০:৫০ অপরাহ্ণ | শনিবার, ০৯ আগস্ট ২০২৫
ajkersangbad24.com | Fayzul Ahmed


