বুধবার ২৩শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৮ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম >>
শিরোনাম >>

স্মরণে সাবেক সংসদ সদস্য মোঃ শরফ উদ্দিন খসরু

ফাতেমা খয়রুন্নেছা   |   বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   6 বার পঠিত

স্মরণে সাবেক সংসদ সদস্য মোঃ শরফ উদ্দিন খসরু

মোঃ শরফ উদ্দিন খসরু আজ আমাদের মাঝে বেঁচে নেই। আর দেখব না তাঁর সোজা হয়ে বসা, সোজা হাঁটা ও শুনবনা তাঁর হাসি মুখে সুন্দর ও মায়াময় কথা। জীবনে চলার প্রতিটি কাজ ছিল তাঁর ব্যতিক্রমধর্মী, অনুকরণী ও মনে গেঁথে থাকার মত বিষয়। তাঁর সংস্পর্শে যারা এসেছেন তারা তাকে ভুলতে পারবেন না, তাঁকে ভুলে যাওয়া প্রায় অসম্ভব। আজ তিনি অতীত। এহেন সমৃদ্ধ অতীতকে আমরা গর্বের সাথে বহন করে চলব। যদিও আজ তিনি স্মৃতি তবুও বলবো তিনি স্মৃতিতে অম্লান হয়ে চিরকাল থাকবেন।

তিনি ছিলেন শান্তিপ্রিয়, সৎ, সকলের প্রিয়জন, সৌভাগ্যশালী ও রহস্যেঘেরা এক পুরুষ ব্যক্তিত্ব। তাঁর মাতৃভক্তি ছিল অনন্য এবং তিনি ছিলেন তাঁর মায়ের নয়নের মণি। তিনি তাঁর পিতার আদর্শে জীবন অতিবাহিত করতে পছন্দ করতেন।
তাঁর বিয়ে হয়েছিল এক শিক্ষিত ও বনেদী পরিবারে। তাঁর স্ত্রী ছিলেন সিলেট সরকারি মহিলা কলেজ থেকে এইচ.এস.সি পর্যন্ত পড়ুয়া একজন পরহেজগার মহিলা, যাঁর নানা ও পিতা দুজনই ছিলেন ম্যাজিস্ট্রেট।

মোঃ শরফ উদ্দিন খসরু দম্পত্তির দুই ছেলে ও এক মেয়ে এবং তিনজনই বিবাহিত। মেয়ে ডাক্তারী পাশ করে স্থানীয় হসপিটালে চিকিৎসক। ছেলে একজন দেশে কাজ করে আর অন্যজন কানাডায় কর্মরত আছেন। তিনি ছিলেন একজন সুবক্তা। তাঁর কণ্ঠস্বর ছিল সুন্দর, সুললিত, জোরালো এবং উচ্চারণ ক্ষমতাও ছিল অসাধারণ। তাঁর অর্থবহ বক্তৃতা মানুষ মুগ্ধ হয়ে শুনতে কোন ক্লান্তি বোধ করতেন না। তিনি বাংলা, উর্দু ও ইংরেজি ভাষায় সমান পারদর্শী ছিলেন। তাঁর হাতের লিখা ছিল খুবই সুন্দর। তাঁর পরিমিত আহার, হাসি মুখে কথা বলার ধরণ, শালিনতা বোধ, নিরহংকার বড়দের
প্রতি শ্রদ্ধা এবং ছোটদের প্রতি অকৃত্রিম ভালবাসা ছিল অনুকরণীয়।

মোঃ শরফ উদ্দিন খসরু’র অসুখ বিসুখ তেমন ছিল না বললেই চলে। বসে থাকতে, এমনকি বসে বসে পড়াশুনা করওে দেখা যায়নি তাঁকে। সবসময় হেঁটেই এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাতায়াত করতেই তিনি অভ্যস্থও ছিলেন। তাঁর জীবনে যতটুকু সফলতা এসেছে তা আপনা আপনিই এসেছে। ক্লাসে প্রথম, বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় প্রথম এবং দুইবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নমিনেশন পেয়ে ১৯৯০ইং সনে জাতীয় পার্টি থেকে এবং ১৯৯৬ ইংরেজিতে বি.এন.পি থেকে নামমাত্র প্রচারনায় দু’বারই রেকর্ড সংখ্যক ভোট পেয়ে জয়লাভ করেন। তিনি ছিলেন ভীষণ পরোপকারী নিজের স্বার্থের ধারে কাছেই তিনি যেতেন না এবং তা তিনি চাইতেনও না।

মোঃ শরফ উদ্দিন খসরু-কে সকল ব্যাপারে সবাই পছন্দ ও যোগ্য মনে করতেন। তিনি ছিলেন হালকা-পাতলা গড়নের সুন্দর ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন সুদর্শন পুরুষ। সিনেমার প্রডিউসার তাঁকে পছন্দমত চরিত্রে অভিনয় করার জন্য সুযোগ দিতে চাইতেন। তবে তিনি সে সুযোগ গ্রহণ করেন নাই এবং সেদিকে তাঁর আগ্রহও ছিলনা। তাঁর ভূগোল, ইতিহাস ও দর্শনে ছিল গভীর জ্ঞান।

ইতিহাসের অনেক বিষয় মোঃ শরফ উদ্দিন খসরু সন ও তারিখ সহ বলতেন এবং ভূগোলের বিষয় বলতেন ম্যাপ উল্লেখ করে। তাঁর লেখালেখিতেও ছিল উল্লেখযোগ্য পারদর্শিতা। তাঁর লেখা কবিতা যেমন ‘অব্যক্ত’, ‘সেও ভালো’। গল্প যেমন ‘বাঘমারা’, ‘রিকশাওলা’ এবং ‘ভাওয়াল রাজ সন্যাসী’। এবং প্রবন্ধ যেমন- ‘ইকবালের চিন্তাধারায় একদিক’ এবং ‘মানব জীবনে শিষ্টাচারের ভূমিকা’ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

মোঃ শরফ উদ্দিন খসরু’র স্মরণ শক্তি ছিল অসাধারণ। বছর দু’এক আগে হঠাৎ একবার আমাদের বাসায় আসেন। কিছু সময় পরে সুযোগ পেয়ে আমার ছেলে তার মোবাইলে ভিডিও করে রাখার জন্য তার মামাকে তাঁর মুখস্ত কবিতা থেকে যে কোন একটি কবিতা আবৃত্তি করে শোনাতে আব্দার করে। তিনি তার মুখস্ত কবিতাগুলো থেকে কবি জীবনানন্দ দাসের দীর্ঘ কবিতা ‘বনলতা সেন’ কবিতাটি আবৃত্তি করে শুনালেন। আমরা সবাই মন্ত্রমুগ্ধের মত শুনলাম আর আমার ছেলে বলল, “মামা, আমি কবিতা আবৃত্তি অনেক শুনেছি, কিন্তু অসাধারণ কবিতা আবৃত্তি এই প্রথম শুনলাম।”
তিনি তাকে বললেন, “তুমি তো আর ১০/১২ দিন আছ, এর ভেতর আরোকদিন এসে তোমাকে কবিতা আবৃত্তি শুনিয়ে যাবা।”

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার প্রাক্কালে যুগ্ধ শুরু হলে পরে শহরের অনেকেই গ্রামের বাড়ীতে থাকাকে নিরাপদ বোধ করতেন। তাই এ সময় শরফ উদ্দিন খসরু সাহেবও ভাদেশ^রের বাড়িতে অবস্থান করছিলেন। একে তো যুদ্ধের তান্ডব তার উপর প্রতিহিংসাপরায়ণ মানুষের প্রতিহিংসা চরিতার্থের সুবর্ণ সুযোগ ও এর ভয়াবহতার ধ্বংস যজ্ঞ। ঘরে বাইরে শত্রু। মানুষ এ সময় প্রতিহিংসা মেটাতে পাকিস্তানী আর্মিকে ভুল তথ্য দিয়ে গ্রামকে গ্রাম পুড়াচ্ছে ও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এ বিপদ ভাদেশ^রেও এসে পড়ল। কে, বা কারা নাকি ভাদেশ^র, দক্ষিণ ভাগ গ্রামে বাংলাদেশী পতাকা টানিয়েছে। পাকিস্তানী আর্মি এ তথ্য পাওয়ার সাথে সাথে স্টেনগান, রাইফেল ইত্যাদি ভারী অস্ত্র শস্ত্র দিয়ে ৩/৪ টা জিপ বোঝাই করে জিপ নিয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হল। জিপ দেখামাত্র যে যেখানে ছিলেন দৌঁড়ে পালালেন। কিন্তু খসরু সাহেব ঠায় দাঁড়িয়ে রইলেন। পাকিস্তানী কর্নেল তখন তাঁর কাছে এসে উর্দুতে এ ব্যাপারে প্রশ্ন করলেন। তিনি তৎক্ষণাত উর্দুতে উত্তর দিলেন, “এখানে আমরা সবাই শান্তি প্রিয়, আমি তো এলাকায় সকাল বিকাল হাঁটাচলা করি কোথাও কোন কিছু টানানো দেখিনি।”

উত্তর শুনে ওরা খুশী হল, তাঁকে জিপে উঠে বসতে বলল এবং তাঁদের গ্রাম ঘোরে তাদেরে দেখাতে বলল। তিনি তাই করলেন। তাঁরা সন্তুষ্ট হয়ে তাদের অস্ত্রশস্ত্র সহ জিপ নিয়ে চলে গেলেন। গ্রামের সবাই হাঁপ ছেড়ে বাঁচলেন এবং খসরু সাহেবকে বাহবা দিলেন।
বাংলাদেশ স্বাধীন হল। আল্লাহর ফজলে কোন সময় ভাদেশ^র গ্রামে এ ধরনের উপদ্রব হয় নাই।

মোঃ শরফ উদ্দিন খসরু একবার ভাদেশ^রের কুড়া নদীর উপর বাঁশের শাঁকো থেকে পড়ে গিয়েছিলেন। ১৯৯০ ইংরেজিতে সংসদ সদস্য হয়ে তিনি সংসদে প্রস্তাব রেখে ছিলেন ভাদেশ^রের কুড়া নদীর উপর ব্রিজ নির্মঅণের জন্য। তাঁর প্রস্তাব বাস্তবায়িত হয়ে কুড়া নদীর উপর ব্রিজ নির্মিত হয়েছিল। তারপর ভাদেশ^র থেকে ফেঞ্চুগঞ্জ যাওয়ার কাঁচা রাস্তাটিও তাঁর প্রচেষ্টায় পাকা রাস্তা হয়েছিল।

তিনি একজন সফল ও ভাগ্যবান ব্যক্তি। বর্তমান তথ্য প্রযুক্তির বদৌলতে তাঁর মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তেও দূরবর্তী আত্মীয়-স্বজনগণও ভিডিও এর মাধ্যমে তাঁর জন্য সক্রিয় ছিলেন এবং মৃত্যুর সাথে সাথে দেশ-বিদেশের সকলেই মুহূর্তের মধ্যে খবর জেনে ফেলে এবং সাথে সাথে পত্র পত্রিকাতে আত্মীয়-স্বজন, রাজনৈতিক মহল, সুহৃদ ব্যক্তিবর্গ তাঁর রুহের মাগফেরাত কামনা করে শোকবার্তা পাঠাতে লাগলেন।

বিশেষ করে তাঁর রাজনৈতিক দলই এবার সরকার গঠন করেছেন। তাই সর্বত্র আপনজনের মত তাঁর প্রতি দোয়া ও পরিবারের প্রতি দোয়া ও সমবেদনা জ্ঞাপন অহরহ চলছে। সর্বপরি তাঁর বড় ছেলে হাসান নিয়মিত ঘরে কুরআন তেলাওয়াত করে, মসজিদে নামাজ পড়ে ও প্রতিদিনই কবর জিয়ারত করতে যায় এবং কবরের পাশে অনেক্ষণ থেকে দোয়া করে। সে বলে সেখানে গেলে তার বাবা নাকি বুঝেন এটা সে অনুভব করে তাই প্রতিদিন একবার সেখানে তার যাওয়া দরকার। মাশআল্লাহ সুসন্তান পিতা-মাতার জন্য ছদগায়ে জারিয়া।

লেখিকা : প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক, সিলেট সরকারি অগ্রগামী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ, সিলেট।

Facebook Comments Box

Posted ৫:৩১ অপরাহ্ণ | বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ajkersangbad24.com |

এ বিভাগের আরও খবর

সম্পাদক
ফয়জুল আহমদ
যোগাযোগ

01712000420

fayzul.ahmed@gmail.com