বুধবার ১৫ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২রা বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম >>
শিরোনাম >>

নবীজির রওজায় সবুজ গম্বুজ যেভাবে এলো

জাহেদুল ইসলাম আল রাইয়ান   |   রবিবার, ১২ এপ্রিল ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   27 বার পঠিত

নবীজির রওজায় সবুজ গম্বুজ যেভাবে এলো

মদিনার আকাশে এক অনন্য প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মসজিদে নববীর সেই সুপরিচিত সবুজ গম্বুজ যার নিচে শায়িত আছেন বিশ্বমানবতার শ্রেষ্ঠ পথপ্রদর্শক হজরত মুহাম্মদ সা.।

এই গম্বুজ শুধু একটি স্থাপত্য নয়, এটি ইতিহাস, ভক্তি, শ্রদ্ধা ও মুসলিম চেতনার গভীরতম আবেগের এক সমবায় প্রতীক। কিন্তু এই গম্বুজ চিরকাল এমন ছিল না, বরং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পরিবর্তন, পুনর্নির্মাণ ও রঙের বিবর্তনের মধ্য দিয়ে এটি আজকের পরিচিত রূপ লাভ করেছে।

ইতিহাসের প্রারম্ভে, রাসুলুল্লাহ সা. এর ইন্তেকালের পর তার রওজা মুবারক ছিল একেবারেই সরল ও অনাড়ম্বর। ৬৩২ খ্রিষ্টাব্দে ইন্তেকালের পর নবীজিকে দাফন করা হয় তারই ঘরে, যা ছিল তার স্ত্রী আয়েশা রা. এর কক্ষ।

সেই ঘরের ওপর কোনো গম্বুজ বা স্থায়ী স্থাপত্য ছিল না। বরং খিলাফতে রাশেদার যুগে এবং পরবর্তী উমাইয়া যুগেও এটি একটি সাধারণ কাঠামোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল, যা ইসলামের সরলতা ও আড়ম্বরবিমুখতার প্রতিফলন।

প্রথম বড় স্থাপত্যিক পরিবর্তন আসে ৭ম শতাব্দীর শেষভাগে, যখন উমাইয়া খলিফা আল-ওয়ালিদ ইবনে আবদুল মালিক মসজিদে নববীর সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেন (প্রায় ৭০৭ু৭০৯ খ্রিষ্টাব্দ)।

এই সম্প্রসারণের সময় নবীজির কক্ষটিকে মসজিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং তার চারপাশে একটি সুরক্ষিত দেয়াল নির্মাণ করা হয়। তবে তখনও কোনো গম্বুজ নির্মিত হয়নি, বরং কাঠামো ছিল নিম্ন ও ছাদ ছিল সমতল।

গম্বুজ নির্মাণের ইতিহাস শুরু হয় আরও পরে, মামলুক যুগে। ১২৭৯ খ্রিষ্টাব্দে মামলুক শাসক সুলতান আল-মানসুর কালাওন প্রথমবারের মতো রওজার ওপর একটি কাঠের গম্বুজ নির্মাণের নির্দেশ দেন। এই গম্বুজটি ছিল কাঠের তৈরি এবং বাইরে সীসা (ষবধফ) দিয়ে আবৃত, যাতে তা আবহাওয়ার প্রভাব থেকে রক্ষা পায়। এটি ছিল বর্তমান গম্বুজের পূর্বসূরি যদিও রূপে ও উপাদানে অনেকটাই ভিন্ন।

পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে গম্বুজটি একাধিকবার সংস্কার ও পুনর্নির্মাণের মধ্য দিয়ে যায়। ১৫শ শতকে এবং বিশেষ করে ১৪৮১ সালের অগ্নিকাণ্ডের পর, গম্বুজটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তখন মামলুক সুলতান আল-আশরাফ কায়তবায় এটি পুনর্নির্মাণ করেন এবং গম্বুজটিকে আরও দৃঢ় কাঠামোয় রূপ দেন। এই সময় গম্বুজটি প্রথমবারের মতো কিছুটা উচ্চতর ও স্থায়ী আকার পায়।

অটোমান যুগে এসে এই গম্বুজ তার বর্তমান পরিচয়ের দিকে এগিয়ে যায়। ১৬শ শতকে সুলতান সুলায়মান দ্য ম্যাগনিফিসেন্ট মসজিদে নববীর বড় ধরনের সংস্কার করেন, তবে গম্বুজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে ১৯শ শতকে। ১৮১৭ সালে অটোমান সুলতান মাহমুদ দ্বিতীয় গম্বুজটি পুনর্নির্মাণ ও সংস্কারের নির্দেশ দেন।

এই সংস্কারের সময়ই গম্বুজটি বর্তমানের মতো সবুজ রঙে রঞ্জিত করা হয়। এর আগে গম্বুজটি বিভিন্ন সময় সাদা, ধূসর বা সীসার স্বাভাবিক রঙে ছিল। সবুজ রঙে রঞ্জনের পর এটি “গ্রিন ডোম” বা “কুব্বাতুল খাদরা” নামে পরিচিতি লাভ করে।

এই সবুজ গম্বুজ আজ মুসলিম বিশ্বের এক অনন্য প্রতীক যেখানে স্থাপত্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে গভীর আধ্যাত্মিকতা। এটি কোনো উপাসনার বস্তু নয়, বরং একটি স্মারক যা নবীপ্রেম, ইতিহাস ও ইসলামের ধারাবাহিকতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে এই গম্বুজ আমাদের মনে করিয়ে দেয় ইসলামের মূল সৌন্দর্য তার সরলতায়, কিন্তু ইতিহাসের ধারায় সেই সরলতাও কখনো কখনো স্থাপত্যের মাধ্যমে স্মৃতিতে রূপ নেয়।

মদিনার সেই সবুজ গম্বুজ তাই কেবল একটি নির্মাণ নয়, এটি এক দীর্ঘ ইতিহাসের নীরব সাক্ষী, যা যুগে যুগে মুসলমানদের হৃদয়ে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও স্মৃতির আলো জ্বালিয়ে রেখেছে।

লেখক: শিক্ষার্থী, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়, কায়রো, মিশর

তথ্যসূত্র: ওফা আল-ওফা (আল-সামহুদী), অটোমান আর্কাইভ (সুলতান মাহমুদ দ্বিতীয়ের সংস্কার, ১৮১৭), ইনসাইক্লোপিডিয়া অব ইসলাম, সৌদি হজ ও ওমরাহ মন্ত্রণালয়ের ঐতিহাসিক তথ্য

Facebook Comments Box

Posted ৭:২১ অপরাহ্ণ | রবিবার, ১২ এপ্রিল ২০২৬

ajkersangbad24.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

গরিবের হক যাকাত
(968 বার পঠিত)

এ বিভাগের আরও খবর

সম্পাদক
ফয়জুল আহমদ
যোগাযোগ

01712000420

fayzul.ahmed@gmail.com