শুক্রবার ১৪ই জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ | ৩১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম >>
শিরোনাম >>

সিলেট নগর গরম গৃহকরে

ফয়জুল আহমদ   |   শুক্রবার, ১০ মে ২০২৪   |   প্রিন্ট   |   25 বার পঠিত

সিলেট নগর গরম গৃহকরে

গৃহকর নিয়ে সিলেট মহানগর এখন উত্তপ্ত। সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) পুনর্নির্ধারিত গৃহকর মানতে নারাজ অনেকেই। তারা বলছেন, সিসিক অস্বাভাবিক হারে গৃহকর বৃদ্ধি করেছে, যা কোনোভাবেই মেনে নেওয়ার নয়। এ অবস্থায় নতুন নির্ধারিত গৃহকর কার্যক্রম স্থগিত করে পুনর্মূল্যায়ন করে সহনীয় কর নির্ধারণের দাবিতে আন্দোলন চলছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক সংগঠন এই দাবিতে মানববন্ধন, সভা-সমাবেশ করছে। মেয়রের কাছে দেওয়া হচ্ছে স্মারকলিপি।

নতুন করে গৃহকর নির্ধারণ করে এখন তুমুল আলোচনায় নবনির্বাচিত মেয়র আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী। গত ৩০ এপ্রিল পঞ্চবার্ষিকী মূল্যায়ন (অ্যাসেসমেন্ট/রি-অ্যাসেসমেন্ট) অনুযায়ী পুনর্নির্ধারিত গৃহকর প্রকাশ করে সিলেট সিটি করপোরেশন। পুনর্নির্ধারিত কর জানতে ও আপিল করতে নগরবাসীকে ১৪ মে পর্যন্ত সময় বেঁধে দেওয়া হয়। এ জন্য নগরভবন প্রাঙ্গণে তথ্য ও সহযোগিতা ক্যাম্প স্থাপন করেছে সিটি করপোরেশন।

সিসিক সূত্র জানায়, পঞ্চবার্ষিক কর মূল্যায়নের জন্য ২০১৯-২০ অর্থবছরে মাঠ জরিপ হয়। ২০২১ সালের আগস্টে সিসিকের তৎকালীন পরিষদের বিশেষ সভায় বর্ধিত এ কর পাস হয়। ওই সময় সিটি করপোরেশনের তৎকালীন ২৭টি ওয়ার্ডের ৭৫ হাজার ৪৩০টি হোল্ডিং থেকে বার্ষিক ১১৩ কোটি ২৭ লাখ ৭ হাজার ৪৪৫ টাকা কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। এটি অনুমোদনের জন্য প্রস্তাবটি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হলে ২০২১ সালের অক্টোবরে তা অনুমোদিত হয়। এদিকে ২০২১-২২ সাল থেকে বর্ধিত কর কার্যকর করার কথা থাকলেও জনক্ষোভ সৃষ্টির আশঙ্কায় তৎকালীন মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী তা কার্যকর করেননি।

পঞ্চবার্ষিকী মূল্যায়নে কী পরিমাণ কর বেড়েছে তা জানতে প্রতিদিন নগরভবনে শত শত ভবন মালিক ভিড় করছেন। বর্ধিত করের পরিমাণ দেখে তাদের চোখ চড়কগাছ। এক লাফে ১০-২০ গুণ কর বৃদ্ধি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না নগরবাসী।

সিলেট সিটি করপোরেশন নতুন এসেসমেন্টের উপর ভিত্তি করে নগরবাসীর ওপর যে কয়েকশ’ গুণ হোল্ডিং ট্যাক্স আরোপ করেছেন তা অযৌক্তিক, গণবিরোধী বলে মন্তব্য করে অবিলম্বে অযৌক্তিক হোল্ডিং ট্যাক্সের সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবি জানিয়েছেন সিলেটের নাগরিকবৃন্দ।

গত বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টায় সিলেটের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে সিলেটের নাগরিকবৃন্দের ব্যানারে প্রতিবাদী মানববন্ধন ও সমাবেশ থেকে এই দাবি জানানো হয়।

মানববন্ধন ও সমাবেশ বক্তারা বলেন, সিটি করপোরেশনের নতুন অ্যাসেসমেন্টের ওপর ভিত্তি করে নগরবাসীর ওপর অমানবিক ভাবে কয়েকগুণ বেশি অনেক ক্ষেত্রে ৫০০ গুণ হোল্ডিং ট্যাক্স আরোপ করেছে, তা অযৌক্তিক, গণবিরোধী।

নেতৃবৃন্দ বলেন, দেশে অর্থনৈতিক সংকট তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। প্রতিদিন বাড়ছে নিত্যপণ্যের দাম। গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি হচ্ছেও পাল্লা দিয়ে। মানুষের জীবনে নাভিশ্বাস উঠছে। ঠিক এই সময়ে সিলেট সিটি করপোরেশনের অযৌক্তিক হোল্ডিং ট্যাক্স আরোপ পুরো নগরবাসীর জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলবে।’

আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় আগামী ১৩ মে সোমবার মেয়র বরাবর স্মারকলিপি দেওয়ার ঘোষণা দেন তারা।

বর্ধিত কর প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে সিলেট বিএনপি, সিলেট মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স, সিলেট বিভাগীয় গণদাবি পরিষদ, সিলেট সচেতন নাগরিক সমাজ, দুর্নীতিমুক্তকরণ ফোরাম বাংলাদেশসহ বিভিন্ন সংগঠন স্মারকলিপি ও বিবৃতি দিয়েছে। মহানগরের কয়েকটি স্থানে বিক্ষুব্ধ নগরবাসী বিভিন্ন ব্যানারে প্রতিবাদ সভা করেছেন। সিটি করপোরেশনের বর্ধিত করকে অযৌক্তিক দাবি করে তা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন।

হোল্ডিং ট্যাক্স সহনীয় পর্যায়ে রাখতে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের মেয়র বরাবর গত বৃহস্পতিবার স্মারকলিপি প্রদান করেছে সিলেট অ্যাপার্টমেন্ট অ্যান্ড রিয়েল এস্টেট গ্রুপ (সারেগ)।

এ বিষয়ে ২৭ নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা আহমদ আলী বলেন, ‘আমি আগে বছরে ৩৬০ টাকা গৃহকর দিয়েছি। এখন আমার গৃহকর ধার্য করা হয়েছে ৪৩২০ টাকা। যা আমার পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়। আপত্তি জানিয়েছি, দেখি মেয়র কি করেন’।

২০ নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা সফিক মিয়া বলেন, ‘আমার প্রতিবছর গৃহকর ছিল ৭৭৫ টাকা। এখন গৃহকর বৃদ্ধি করে ধার্য করা হয়েছে ৬৮০০ টাকা। এটা কি করে সম্ভব। গৃহকর এক সাথে এত টাকা বৃদ্ধি করলে দেওয়া যাবে নাকি। আমি শুধু গৃহকর দিলে হবে। আমার আর কোনো খরচ নাই। এমনিতে দ্রব্যমূল্য যেভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, সংসারের খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে’।

১৫ নং ওয়ার্ডে ভাড়া বাসায় থাকেন সোহেল মিয়া। তিনি বলেন, ‘আমাদের বাসার মালিক প্রতি বছর বাসা ভাড়া বৃদ্ধি করছে। কিন্তু প্রতি বছর তো হোল্ডিং ট্যাক্স বৃদ্ধি করা হচ্ছে না। সিটি করপোরেশন হোল্ডিং ট্যাক্স বৃদ্ধি করলে, বাসা ভাড়া আরও বৃদ্ধি করবে মালিকরা। ক্লিন ও স্মার্ট সিটি গড়তে হোল্ডিং ট্যাক্স বৃদ্ধি করা জরুরি। বাসার মালিকরা আগে যে পরিমাণ হোল্ডিং ট্যাক্স দিয়েছে তা কোনো ট্যাক্সের আওতায় পড়ে না’।

১৮নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা মানবাধিকার কর্মী মো. ইউসুফ সেলু বলেন, আমার একজন প্রতিবন্ধী ছেলে আছে। তার জন্য প্রতি মাসে আমার বাড়তি খরচ করতে হয়। এ অবস্থায় আমি প্রতি বছর ২৭০ টাকা হোল্ডিং ট্যাক্স দিয়েছি। প্রয়াত মেয়র বদরউদ্দিন আহমদ কামরান আমাকে হোল্ডিং ট্যাক্স মওকুফ করে দিয়েছিলেন। সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী ২৭০ টাকা কর ধার্য করে দেন। অথচ এবার আমার বাসার হোল্ডিং ট্যাক্স ধার্য করা হয়েছে ১৫ হাজার টাকা। যা আমার পক্ষে পরিশোধ করা সম্ভব নয়। আমি আপত্তি জানিয়েছি। আমার আপত্তি গ্রহণ করা না হলে আমরা আন্দোলনে যাব।

এদিকে গত বৃহস্পতিবার (৯ মে) সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র মো. আরিফুল হক চৌধুরী সংবাদ সম্মেলনে নতুন করে যে গৃহকর নির্ধারণ করা হয়েছে তা স্থগিত করার অনুরোধ জানান।
তিনি বলেন, সিটি করপোরেশনে তার মেয়াদে নতুন করে হোল্ডিং ট্যাক্স বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। তবে করোনা পরিস্থিতি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি বিবেচনা করে সেটা আর বাস্তবায়ন করা হয়নি। স্থগিত করা হয়েছিল। তাই তার ওপর আনীত অভিযোগকে একটি ভুল বোঝাবুঝি উল্লেখ করে আরিফ নতুন পরিষদকে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সাথে বসে হোল্ডিং ট্যাক্স সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসার আহ্বান জানান।

এ ব্যাপারে মেয়র আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী বলেন, ‘জনগণের ভোটে আমি মেয়র নির্বাচিত হয়েছি। জনগণের ভোগান্তি হয় এমন কোনো কাজ আমাকে দিয়ে হবে না। হোল্ডিং ট্যাক্স নিয়ে যদি কোনো অসংগতি বা অমিল থাকে তবে অবশ্যই ডি ফরমের মাধ্যমে আপত্তি জানানোর ব্যবস্থা রয়েছে। এ নিয়ে নগরবাসী উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। এ ব্যাপারে নাগরিকদের সঙ্গে আলোচনা করেই একটি যৌক্তিক সিদ্ধান্তে পৌঁছাব।’

 

Facebook Comments Box

Posted ৯:১৬ অপরাহ্ণ | শুক্রবার, ১০ মে ২০২৪

ajkersangbad24.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

এ বিভাগের আরও খবর

সম্পাদক
ফয়জুল আহমদ
যোগাযোগ

01712000420

fayzul.ahmed@gmail.com